তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের কোলে সবুজ চরের দেশ
সুন্দরগঞ্জ বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত এই উপজেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর।
চরাঞ্চল বহুল এই উপজেলায় বিস্তৃত কৃষিজমি রয়েছে এবং জনজীবন মূলত কৃষিকাজকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে ধান, ভুট্টা ও মিষ্টিআলু চাষ এখানকার মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস।
প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙন এখানকার মানুষের জীবনে বড় চ্যালেঞ্জ হলেও তাঁরা অদম্য মনোবলে এগিয়ে চলেন।
শতাব্দীর পুরনো এই জনপদের ইতিহাস নদী ও কৃষির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
সুন্দরগঞ্জ নামের উৎপত্তি নিয়ে দুটি মত রয়েছে। প্রথমত, তিস্তা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই এলাকার বাণিজ্য কেন্দ্র বা 'গঞ্জ'টি সুন্দর ছিল বিধায় এর নাম "সুন্দরগঞ্জ"। দ্বিতীয়ত, প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে বসবাসকারী সুন্দর সিংহ নামক এক ব্যক্তির নামানুসারে এর নামকরণ হয়েছে।
১৮৫৫ সালে ব্রিটিশ সরকার সুন্দরগঞ্জকে থানা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দীর্ঘ ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমে সুন্দরগঞ্জ ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্তি পায়।
১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে পাকিস্তানি বাহিনী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেলে ১০ ডিসেম্বর সকালে বীর মুক্তিযোদ্ধারা সুন্দরগঞ্জ থানায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ফলে ১৯৮৪ সালে সুন্দরগঞ্জ থানা পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে এটি গাইবান্ধা জেলার অন্যতম বৃহত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা।
নদীঘেরা সবুজ চরের দেশ সুন্দরগঞ্জ প্রাকৃতিকভাবে অনন্য।
উপজেলার পশ্চিম ও উত্তর সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী এই অঞ্চলের জীবনরেখা। এই নদীর তীরে চাষাবাদ ও মৎস্য শিকার হয়।
পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদী উপজেলার কৃষি ও যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নদীর বুকে জেগে ওঠা অনেক চরে হাজার হাজার মানুষ বাস করেন। চরের জমি অত্যন্ত উর্বর ও কৃষির জন্য উপযুক্ত।
উপজেলার অধিকাংশ এলাকা সমতল, যা ধান ও অন্যান্য ফসল চাষের জন্য উপযুক্ত। উর্বর পলিমাটি এখানকার কৃষির শক্তি।
ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থিত। গ্রীষ্মে গরম ও আর্দ্র, বর্ষায় প্রচুর বৃষ্টি এবং শীতকালে মাঝারি ঠান্ডা পড়ে।
নদী ও চরাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, মাছ ও বন্যপ্রাণী দেখা যায়। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।
সুন্দরগঞ্জের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। উপজেলার প্রায় ৮০% মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত।
আউশ, আমন ও বোরো তিন মৌসুমে ধান চাষ হয়
চরাঞ্চলে ব্যাপক ভুট্টা চাষ হয়, রপ্তানিও হয়
চরের বালু মাটিতে মিষ্টি আলু চাষ বেশ জনপ্রিয়
সোনালী আঁশ পাট এখনও গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল
বেগুন, লাউ, শিম সহ বিভিন্ন শাকসবজি চাষ হয়
রবি মৌসুমে সরিষা চাষে উপজেলা স্বনির্ভর
শীতকালীন ফসল হিসেবে গম চাষ ক্রমশ বাড়ছে
নদী ও পুকুরে মাছ চাষ গুরুত্বপূর্ণ জীবিকা
উপজেলার প্রধান জীবিকা। বোরো ধান ও ভুট্টা সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়। চরাঞ্চলে নতুন জমিতে চাষ বাড়ছে।
গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন এলাকার অনেক পরিবারের আয়ের উৎস। দুগ্ধ উৎপাদনও হয়।
বাঁশ-বেতের কাজ, মাটির পাত্র তৈরি, কাপড় বোনা এবং হস্তশিল্পে অনেক মানুষ কর্মরত।
অনেকেই দেশের বিভিন্ন শহরে এবং বিদেশে কর্মরত। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উপজেলায় বেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করছে।
উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম
উপজেলার অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম মাধ্যমিক বিদ্যালয়
বেশ কিছু দাখিল ও আলিম মাদ্রাসা রয়েছে এলাকায়
৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি হাসপাতাল, বহির্বিভাগ সেবা সক্রিয়
উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় ইউনিয়নভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিক সক্রিয়
শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখছে
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় যুব উন্নয়নে কাজ হচ্ছে
প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙন এখানকার মানুষের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবুও তাঁরা অদম্য মনোবলে টিকে থাকেন।
বর্ষা মৌসুমে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। হাজার হাজার পরিবার সাময়িকভাবে বাস্তুহারা হন।
তিস্তা নদীর ভাঙনে প্রতি বছর অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারান। চরাঞ্চলের মানুষ বারবার স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হন।
শীতকালে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষদের কষ্টে ফেলে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ত্রাণ সহায়তা দেয়।
সরকার ও বিভিন্ন এনজিও যেমন BRAC, ব্র্যাক, আশা, ও RDRS চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলস কাজ করছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, চর উন্নয়ন প্রকল্প ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের জীবনে আশার আলো আসছে।
সুন্দরগঞ্জের মানুষের সাংস্কৃতিক জীবন সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়।
সুন্দরগঞ্জ সড়কপথ ও নৌপথে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে সংযুক্ত।
গাইবান্ধা জেলা, রংপুর বিভাগ, বাংলাদেশ
২৫.০°N, ৮৯.৫°E অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত
গাইবান্ধা জেলা সদর থেকে সুন্দরগঞ্জ সড়কপথে সরাসরি সংযুক্ত। বাস ও সিএনজি সার্ভিস আছে।
তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে নৌকা ও ট্রলারে চরাঞ্চলে যোগাযোগ হয়। বর্ষায় নৌপথই প্রধান উপায়।
ভ্যান, রিকশা ও অটোরিকশা স্থানীয় যোগাযোগের প্রধান বাহন। গ্রামাঞ্চলে সাইকেলও প্রচলিত।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা গুণীজনদের জন্মভূমি।
উপজেলার বহু সাহসী সন্তান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন এবং দেশ স্বাধীনে অবদান রেখেছেন।
স্থানীয় কবি, সাহিত্যিক ও শিক্ষকরা উপজেলার সাংস্কৃতিক জীবনকে সমৃদ্ধ করে আসছেন।
চরাঞ্চলে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি প্রবর্তনকারী কৃষি উদ্যোক্তারা এলাকার অর্থনীতি বদলে দিচ্ছেন।